Friday, May 29, 2020

একজন হুমায়ূন-চলচ্চিত্র যার প্রাণ


একজন হুমায়ূন-চলচ্চিত্র যার প্রাণ 



হুমায়ূন আহমেদ এর চোখে হুমায়ুন ...
শিল্পীর তুলিতে হুমায়ূন ফরিদী


সেই ১৯৫২ সালের কথা। ২৯ মে এটিএম নূরুল ইসলাম বেগম ফরিদা ইসলামের ঘর আলো করে এলো দ্বিতীয় সন্তান। বাবা মা শখ করে তার নাম রাখলেন হুমায়ূন। সেদিন তারা হয়ত্রো ভাবতেও পারেনি তাদেরই হুমায়ূন বাংলা অভিনয় জগতের বাদশা হুমায়ূন হয়ে উঠবে।

হ্যা, আমি হুমায়ূন ফরিদীর  কথা বলছি। সেই হুমায়ূন ফরিদী, সংসপ্তক এর হুমায়ূন ফরিদী, কোথাও কেউ নেই এর হুমায়ূন ফরিদী। ফরিদী এমন অনেক কালজয়ী চরিত্রে নিজেকে এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে চাইলেও তার অভিনয়ের মোহ কাটানো সম্ভব হবে না হাজার বছরেও।

হুমায়ূন ফরিদীর অভিনয় জীবনের শুরু উচ্চমাধ্যমিকে থাকতেই। পিতার চাকরির সুবাদে তখন সবে মাদারীপুরের ইউনাইটেড ইসলামিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন ফরিদী। সেখানেই শিল্পী নাট্যগোষ্ঠী নামের একটি সংগঠনের বাশার মাহমুদ এর হাত ধরেই যুক্ত হন মঞ্চ নাটকের সাথে। কল্যাণ মিত্রের 'ত্রিরত্ন' নাটকে 'রত্ন' চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তিনি সর্বপ্রথম দর্শকদের সামনে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর একে একে 'টাকা আনা পাই', 'দায়ী কে', 'সমাপ্তি', 'অবিচার'সহ ৬টি মঞ্চ নাটকে অংশ নেন ফরিদী।

তবে নিজেকে পুরোপুরি মেলে ধরার সুযোগটা পান জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকাকালীন সময়ে। যদিও মুক্তিযুদ্ধের আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে  জৈব রসায়ন বিভাগে অনার্স কোর্সে ভর্তি হয়েছিলেন কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পড়ালেখা ছেড়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। পরে তিনি ১৯৭২ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে স্নাতক (সম্মান) কোর্সে ভর্তি হন। স্নাতক ফাইনাল পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করে নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৭৬ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালীন সময়েই তিনি ঢাকা থিয়েটারে যোগ দেন এবং নাট্যোৎসবের প্রধান আয়োজক হিসেবে কাজ করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

সে সময়েই আরেক নাট্যপুরধা সেলিম আল দীনের সানিধ্যে আসেন হুমায়ূন। এই দুইজনের যুগলবন্দী সেই সময় বাংলার মঞ্চ নাটককে নিয়ে গিয়েছিলো সমৃদ্ধির শিখরে। আশির দশকে টেলিভিশন নাটকে হুমায়ুন ফরীদির অভিষেক ঘটে নিখোঁজ সংবাদ নাটকের মাধ্যমে। তারপর কেবলই সামনে এগিয়ে যাওয়ার গল্প। একে একে নীল নক্সার সন্ধানে (১৯৮২), দূরবীন দিয়ে দেখুন (১৯৮২), ভাঙ্গনের শব্দ শুনি (১৯৮৩), বকুলপুর কত দূর (১৯৮৫), দুভুবনের দুই বাসিন্দা, একটি লাল শাড়ি, মহূয়ার মন (১৯৮৬), সাত আসমানের সিঁড়ি (১৯৮৬), একদিন হঠাৎ (১৯৮৬), চান মিয়ার নেগিটিভ-পজেটিভ (১৯৮৬), ওযাত্রা (১৯৮৭), সংসপ্তক (১৯৮৭-৮৮), পথের সময় (১৯৮৯), দুই ভাই (১৯৯০), শীতের পাখি (১৯৯১), কোথাও কেউ নেই (১৯৯০), সমুদ্রের গাঙচিল (১৯৯৩), তিনি একজন (২০০৫), চন্দ্রগ্রস্ত (২০০৬), কাছের মানুষ (২০০৬),  মোহনা (২০০৬), ভবের হাট (২০০৭), শৃংখল (২০১০), প্রিয়জন নিবাস (২০১১) ইত্যাদি নাটকে নিজের অভিনয়কে নিজেই ছাড়িয়ে গেছেন বারবার। এর মধ্যে সংসপ্তক নাটকেরকান কাটা রমজানচরিত্রটি ফরীদিকে বাংলা নাট্যপ্রেমী দর্শকের কাছে আজীবন সরণীয় করে রাখবে। ফরিদীর সবচেয়ে বড় সফলতা তিনি টেলিভিশন নাটকের প্রথাগত ধ্যান ধারণা ভেঙ্গে সৃষ্টি করেন এক নতুন অভিনয় ধারা।

চলচ্চিত্রে ফরিদীর অভিনীত বেশিরভাগ চরিত্রই ছিলো খল চরিত্র। খল চরিত্রেও নিজের অভিনয়গুনে অনেকক্ষেত্রেই নায়ককেও ছাপিয়ে গেছেন তিনি। ফরিদীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য একটা দিক হচ্ছে তিনি একাধারে আর্ট ফিল্ম এবং বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রে খুব সাবলিলভাবে অভিনয় করতেন। আর্ট ফিল্মে তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো হুলিয়া, ব্যাচেলর, আহা, মাতৃত্ব, বহুব্রীহী, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র জয়যাত্রা, শ্যামল ছায়া একাত্তরের যিশু। এর মধ্যে মাতৃত্ব চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি ২০০৪ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর অভিনীত বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রের মধ্যে উল্লেলখযোগ্য হলো দহন, সন্ত্রাস, বিশ্বপ্রেমিক, ত্যাগ, মায়ের মর্যাদা, অধিকার চায়, মায়ের অধিকার, ভন্ড, রিটার্ন টিকেট, প্রাণের চেয়ে প্রিয়, কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি, দূরত্ব, পদ্মানদীর মাঝি  ইত্যাদি।

ফরিদী নেই, ফরিদী আছেন, ফরিদী থাকবেন ...
হুমায়ূন ছিলেন সবার থেকে আলাদা। সবার থেকে উপরে।

ব্যাক্তিজীবনে হুমায়ূন ফরিদী দুইবার বিয়ে করেছিলেন। আশির দশকে প্রথমার বিয়ে করলেও সেই সংসার স্থায়ী হয় নি। পরবর্তীতে অভিনেত্রী সুবর্ণা মোস্তফাকে ভালোবেসে বিয়ে করেন হুমায়ূন ফরিদী।  কিন্তু ২০০৮ সালে তাদের মধ্যে বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটে। সুবর্নাকে অত্যাধিক ভালোবাসতেন ফরিদী। সুবর্না চলে যাওয়ার পর বাকি জীবনটা একাই কাটিয়েছেন ফরিদী।

২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাথরুমে পড়ে গিয়ে মাথায় প্রচন্ড আঘাত পান ফরিদী। আর এই আঘাতেই মৃত্যু হয় বাংলা অভিনয় জগতের মুকুটহীন বাদশা হুমায়ূনের। সবাই যেদিন বসন্তের আগমনের উৎসবে মাতোয়ারা সেদিনেই একেবারে নিরবে সবাইকে ছেড়ে চলে জান পরপারে। 
তাঁর কোনো বিশেষ কাজ বা বিশেষ অবদান উল্লেখ করতে যাওয়া নিতান্তই হাস্যকর।মানুষ তাঁকে অমুক নাটকে, অমুক ছবিতে তমুক চরিত্রের জন্য মনে রাখবে’- এসব বলারও কোনো মানে নেই। যা কিছু করেছেন, যখন যেভাবে করেছেন- সবই শ্রেষ্ঠ। ওয়ান অ্যান্ড ওনলি হুমায়ুন ফরিদী শো। দেশের অভিনয় জগতে তাঁকে শ্রেষ্ঠতম চরিত্রাভিনেতা কিংবা মেথড অ্যাক্টর- যেটাই বলুন না কেন, একবাক্যে মেনে নেবেন সবাই। বিচিত্র, বেখেয়ালি, বেসামাল আর বেপরোয়া ব্যক্তিজীবনের মতোই বিস্তৃত তাঁর অভিনয়জীবন। নায়ক, খলনায়ক, মহানায়ক- সব সময়ই চরিত্রকে ছাপিয়ে গেছেন আবার চরিত্রেই বিলীন হয়েছেন- কারণেই তিনি হুমায়ুন ফরিদী। এটা হয় তো একমাত্র তাঁর পক্ষেই সম্ভব ছিল।


হুমায়ুন ফরিদীর হাসি কানে বাজছে। খোলা গলার, উদাত্ত হাসি।



একজন হুমায়ূন-চলচ্চিত্র যার প্রাণ

একজন হুমায়ূন-চলচ্চিত্র যার প্রাণ  শিল্পীর তুলিতে হুমায়ূন ফরিদী সেই ১৯৫২ সালের কথা। ২৯ মে এটিএম নূরুল ইসলাম ও বেগম ফর...