| কাজী হামিদুল হক |
মানুষটাকে
আমার
সিংহ
মনে
হতো।
ঠিকভাবে
বলতে
গেলে
দুটি
কারনে
তাকে
সিংহই
মনে
হতো
আমার।
প্রথমত
তার
শ্বেত
শ্মশ্রুমণ্ডিত,
কাঁচা-পাকা
লম্বা
চুল,
সেই
চুল
আবার
ব্যান্ড দিয়ে বাঁধা, ঋজু শরীর। আর দ্বিতীয়ত তার সাহস আর কর্মগুণ।
মানুষটার
নাম
কাজী
হামিদুল হক।
একাধারে আলোকচিত্রী ও অভিযাত্রী হামিদুল হক নিজেকে স্কুবা ডাইভার অ্যান্ড আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফার হিসেবে পরিচয় দিতেই বেশি পছন্দ করতেন। তবে বাংলাদেশের বেশিরভাগ অভিযাত্রী আর অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষের কাছে তিনি পরিচিত অ্যাডভেঞ্চার গুরু হিসেবে। কারনটাও যে খুব স্পষ্ট। ৫৪ বছরের ক্ষুদ্র একটা জীবনে অভিযাত্রী হিসেবে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। বাংলা চ্যানেলের আবিষ্কারক হিসেবেই উনি অধিক পরিচিত হলেও তার অন্যান্য অভিযানগুলোও শিহরিত করবে যে কাউকে।
তাঁর বাবা
ছিলেন
ভূতত্ত্ববিদ ও খনি প্রকৌশলী। চাকরির সূত্রে তিনি তখন আসামে। সে সময় ১৯৪৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আসামে জন্ম নেন কাজী হামিদুল হক। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তৃতীয় হামিদুল হক ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। এরপর পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি নেন। তারপর চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে আর্ট ইনস্টিটিউট অব বোস্টন থেকে আলোকচিত্রে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন ১৯৭৪ সালে। সে সময়টায় নানা ধরনের ছবি তুলতেন।
স্নাতক
করার
পর
চলচ্চিত্র নির্মাণ বিষয়ে একটা কোর্স করেন নিউইয়র্কে। সেখানেই জীবনের দিক পরিবর্তন হয় তার। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে নিউইয়র্কে এক প্রবীণ স্কুবা ডাইভারের (ডুবুরি) সঙ্গে পরিচয় ঘটে কাজী হামিদুল হকের। তাঁর কাছেই হাতেখড়ি ডুবসাঁতারে। হামিদের আগ্রহ তৈরি হয় অতল জলের বিচিত্র-বর্ণিল জগতের প্রতি। এ সময়টাতেই জলের নিচে ছবি তোলার কৌশল শিখে ফেলেন। ডুব দেওয়া আর জলের নিচে ছবি তোলাই হয়ে ওঠে হামিদের পেশা। তিনি সাগরের ২০০ ফুট নিচ পর্যন্ত ডুব দেওয়ার জন্য লাইসেন্সধারী ছিলেন।
এত কিছুর
মধ্যেও
কিছু
একটা
অপূর্ণতা ছিল আর সেটা হল মাতৃভূমি থেকে দূরে থাকা। তাইতো সব ছেড়েছুড়ে ১৯৯৪ সালে স্থায়ীভাবে ফিরে আসেন বাংলাদেশে। ঘাঁটি গাড়েন ১০৭ আজিমপুর, পৈতৃক বাড়িতে।
কিন্তু
তাতে
তার
অভিজানের নেশায় ভাটা পরেনি। তিনি বাংলাদেশের প্রথম পরিপূর্ণ ট্রাইথলন ম্যান ছিলেন বললেও ভুল বলা হবে না। সাতার, দৌঁড় আর সাইক্লিং। এই তিনটা মিলে যেটা হয় সেটাকে বলে ট্রাইথলন।আর এই তিনটাতেই তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী।
| বাংলা চ্যানেলে কাজী হামিদুল হক |
বাংলা চ্যানেল বলে পরিচিত শাহপরীর দ্বীপ থেকে সেন্ট মার্টিন পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে ১৪ দশমিক ৪ কিলোমিটার এলাকার আবিষ্কারকও তিনি। এর আগে ২০০৪ সালে ঢাকা থেকে নৌকায় সেন্ট মার্টিন অভিজান পরিচালনা করেছিলেন তিনি। ভয়ংকর সেই অভিযানে উনার সাথে ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম এভারেস্ট বিজয়ী মুসা ইব্রাহীম সহ আরো ১৩ অভিযাত্রী।
| ছবি তোলা ছিল তার নেশা |
শুধু অভিযাত্রা না, ছবি তোলাতেও ছিলো তার ব্যাপক নেশা। পানির নিচের ছবি তোলায় বাংলাদেশে তাঁকে পথিকৃৎ বলা যায়। সেন্ট মার্টিনে বঙ্গোপসাগরে প্রবালের দারুণ সব ছবি তিনি তুলেছেন। আন্ডার ওয়াটার ফটোগ্রাফির প্রশিক্ষণ দিয়েছেন বিটিভির চিত্রগ্রাহকদের। বেশ কয়েকজন তরুণ আলোকচিত্রীও তাঁর কাছে জলের তলায় ছবি তোলার কৌশল শিখে নিয়েছেন।
প্যানারোমিক ছবির ব্যাপারে ছিল ব্যাপক আগ্রহ। এ জন্য যখন যা ক্যামেরা, লেন্স দরকার সবই সংগ্রহ করতেন। আর শেখাতেন তরুণদের।
নিজেকে সবসময় চ্যালেঞ্জে রাখতে পছন্দ করতেন এই স্বপ্নদ্রষ্টা। নিজের মৃত্যু নিয়ে কাছের মানুষদের হামিদুল হক বলতেন, ‘আই উড রাদার বি ইটেন বাই দ্য শার্ক, বাট আই উড নট লাইক টু ডাই অন দ্য ল্যাপ অব এ ডক্টর।’ কিন্তু
বিধাতার হয়তো অন্য ইচ্ছে ছিলো। হামিদুল হকের দেহে বাসা বেঁধেছিল ক্যান্সার। তাঁর চিকিৎসাও চলেছে। কিন্তু এ কথা তাঁর স্ত্রী হামিদা আক্তার, খুব কাছের তিন-চারজন ছাড়া কেউ জানতেন না। প্রথম দিকে চিকিৎসাও নিতে চাননি। পরে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসা হয় তাঁর। বাসায় ফিরে আসেন। এরপর তিনি নিজের গ্রামের বাড়ি নওগাঁর মহাদেবপুরে যাওয়ার ইচ্ছা জানান। ১৯ ফেব্রুয়ারি সকালে হামিদা আক্তারকে সঙ্গে নিয়ে মহাদেবপুর থেকে বাসে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন কাজী হামিদুল হক। বাসটা যখন বগুড়ার শেরপুরের কাছাকাছি, তখন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। শেরপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ততক্ষণে তিনি পাড়ি জমিয়েছেন অসীম শূন্যতায়। মাত্র ৬৪ বছর বয়সে। রাতে ঢাকায় আজিমপুর কবরস্থানে বাবার কবরেই দাফন হয় কাজী হামিদুল হকের।
নিজের জীবনকে
নানা
খাতে
বইতে
দিয়েছেন কাজী হামিদুল হক। একেবারে একজন অভিযাত্রীর মতো। তারুণ্যের পুরো শক্তি তাঁর মধ্যে ছিল একেবারে মৃত্যুর আগের সময় পর্যন্ত।
কাজী হামিদুল হকের জীবনপ্রদীপ হয়তো নিভে গেছে ক্যান্সারের কাছে হেরে তবে যে কীর্তি তিমি গড়ে গেছেন তা কেউ মুছতে পারবে না। বাংলা চ্যানেল পার হওয়া প্রত্যেক অভিযাত্রীর মাঝে নতুন করে জন্ম নিবে একেকজন হামিদুল হক।